Wednesday, May 8, 2013

শাপলা চত্বরে আর সমাবেশ নয়, দাবি ব্যাংকারদের


ঢাকা: রাজধানীর ব্যস্ততম বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ব্যাংকপাড়া মতিঝিল শাপলা চত্বরে আর সমাবেশ চান না ব্যাংকাররা।
এমননিতেই মাত্র ৫ সপ্তাহের মধ্যে ব্যস্ততম এই চত্বরে আয়োজিত হেফাজতের দু’টি ও বিএনপির একটি সমাবেশের প্রভাবে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছে মতিঝিল ও
এর আপশপাশের ব্যাংক-বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। তারওপর গত রোববারের সমাবেশ থেকে চালানো হেফাজতের তাণ্ডবে আতঙ্কিত ব্যাংকারদের মনে তীব্র ক্ষোভ বাসা বেঁধেছে।
বিষয়টি নিয়ে ভীষণ অসন্তুষ্ট বাংলাদেশ ব্যাংকও এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ দেশের বড় বড় সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় মতিঝিলে হওয়ায় এখানে আর সমাবেশ করতে না দেওয়ার বিষয়টি দ্রুতই জোরালো হয়ে উঠছে।
সূত্রমতে, শাপলা চত্বরে আর যাতে কাউকে সমাবেশের অনুমতি সরকার না দেয় সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর সঙ্গে বেশ জোরেসোরেই যোগাযোগ চালাচ্ছে ব্যাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।       
হেফাজতের সাম্প্রতিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে তারা বলছেন, মতিঝিলে কিভাবে এমন কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেওয়া হয় তা মোটেও বোধগম্য নয়। একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে তাদের ক্ষোভের কথা জানা গেছে।
একই কথা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও।  
সূত্র জানিয়েছে, মতিঝিলে প্রায় ২৮ থেকে ৩০টি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রয়েছে। এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাজনৈতিক সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হলে সহিংসতার সুযোগ নিয়ে যে কোনো সময় বড় ধরনের লুটপাটের ঘটনাও ঘটতে পারে। আর এই লুটপাটের মোচ্ছবে জড়িত হয়ে যেতে পারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে যোগ দিতে আসা  উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা। আর এমনটি হলে তা আর্থিক খাতে নতুন করে এক সংকট তৈরি করবে।

তবে মন্ত্রিসভার সর্বশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী  নির্দেশ দিয়েছেন, ভবিষ্যতে মতিঝিলে এমন কর্মসূচি যাতে না করতে দেওয়া হয়।
জানা গেছে, অতীতে এমনটি খুব বেশি দেখা যায় নি। চলতি বছরেই এটি ব্যাপক আকার ধারণ করছে। এর শুরুটি করে জামায়াত-শিবির- মতিঝিলে তাদের কর্মসূচি পালনের মধ্যে দিয়ে। এরপর বিএনপি ও সবশেষ হেফাজত তাদের নাশকতার মূল লক্ষ্য করে মতিঝিলকে। মতিঝিলকে কেন্দ্র করেই তারা কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে চায়।

সূত্রগুলো বলছে, বেশ কয়েকটি কারণ থেকে রাজনৈতিক দলগুলো মতিঝিলকে কর্মসূচির কেন্দ্র হিসেবে নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-প্রথমত, রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনীতির ওপর সরাসরি কুপ্রভাব ফেলা। দ্বিতীয়ত, মতিঝিল আকারে ছোট পরিসরের হওয়ায় সেখানে রাজনৈতিক জমায়েত বেশি দেখানো যায় খুব সহজে। এছাড়া হেফাজত ও জামায়াত-শিবির এই এলাকাকে বেছে নিচ্ছে মূলত এলাকাটি তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত বলে।

সূত্র জানিয়েছে, এখন যোগাযোগ চলছে। সরকারকে শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের সভা-সমাবেশের অনুমতি না দেওয়ার অনুরোধ জানাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ব্যাপারে খোদ গভর্নর সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। সবশেষ হেফাজতের কর্মসূচিতে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ ভাংচুর এবং লুটপাটের চেষ্টায় বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আর মতিঝিল এলাকায় রাজনৈতিক সমাবেশের পক্ষে নয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক এএফএম আসাদুজ্জামান বাংলানিউজকে বলেন, “মতিঝিলে অধিকাংশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক-চত্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থান। সবদিক বিবেচনা করলে মতিঝিল সভা, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার জায়গা হতে পারে না। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের প্রধান, র‌্যাবের প্রধান এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রধানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবস্থা নিতে বলবে বাংলাদেশ ব্যাংক। শিগগিরই আমরা লিখিতভাবে বিষয়টি বলব সংশ্লিষ্টদের।”

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকও এমন কর্মসূচির কারণে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। সেখানে নিরাপত্তার জন্য মাত্রা ২৫ থেকে ৩০ জন পুলিশ থাকে। যা বড় কোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। এছাড়া এর পাশেই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকসহ মতিঝিল শাপলা চত্বরে আরো কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ অফিস।

পরিস্থিতি বিবেচনায় মতিঝিল এলাকায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেওয়ার বিপক্ষে তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “এখনই সরকারকে শক্তভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে মতিঝিলকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। তা না হলে একটি বড় অঘটন ঘটলে তার দায়িত্ব কে নেবে?”

এদিকে, বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলে অবস্থান কর্মসূচিসহ বিভিস্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ডিসিসিআই)। আগামী দিনগুলোতে মতিঝিলে এ ধরনের কর্মসূচি না দেবার জন্য আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ী এ সংগঠনটি।

সংগঠনটি বলছে, বিগত প্রায় ৬ মাস ধরে দেশের বিভিন্ন সংগঠন রাজধানী ঢাকার প্রধান ও ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলে জনসমাবেশের পাশাপাশি নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করছে। এর ফলে এ ব্যস্ততম এলাকায় জনগণের স্বাভাবিক চলাচল ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে পরিচালনা বিঘ্ন  হচ্ছে।

জানা গেছে, রাজনৈতিক যে কোনো কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রবেশ ও বাহির দু’টি গেটের সামনে অবস্থান নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ কারণে দুপুর ১২টার পর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দু’টি গেট বন্ধ রাখতে হয়। এতে করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

এদিকে, বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করতে এরই মধ্যে ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌখিক নির্দেশনা পেয়ে এরই মধ্যে বেশিরভাগ ব্যাংক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়াতে শুরু করেছে।

No comments:

Post a Comment