Wednesday, May 8, 2013

‘ও নাতি বাপ কডে পাবি’


হাটহাজারী থেকে ফিরে:  পোস্টমর্টেম শেষে জসিমের লাশ তখনো পৌঁছায়নি বাড়িতে। তার আড়াই মাস বয়সি বাচ্চা কোলে নিয়ে আহাজারি করছেন মা রোশনারা বেগম। পাশে নির্বাক বসে আছেন বাবা মো.সিরাজুল হক।  
অবুঝ শিশুটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাব বার গুমড়ে কেঁদে উঠছেন তিনি। আর বলছেন ‘আর পোয়ারে কডে পাইয়ম (আমার ছেলেকে কোথায় পাব), ও নাতি তুই বাপ কডে পাবি
( ও নাতি তুই বাবা কোথায় পাবি)।’
সোমবার বিকেলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা সদরে হেফাজত-পুলিশ সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হয়। তারা হলেন, সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট সাইদুর রহমান (৩৫), আনোয়ার জাহেদ (২২), মো. মামুন (২৩), মো.জসিম উদ্দিন (৩০)আবু নোমান (৪০)ও মো.সাজ্জাদ(১৭)।
জসিম উদ্দিন হাটহাজারী সদরের মিরের দক্ষিণ খিল হাসেম কর্ণেল’র বাড়ির মো.সিরাজুল হকের সন্তান।
বাজারে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরলো জসিম:
জসিম উদ্দিনের দুবাই প্রবাসি চাচাত ভাই মো.ইয়াছিন জানান, সোমবার বিকেলে বাজার করার জন্য হাটহাজারী বাজারের উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা দেন তারা। এসময় হাটহাজারী দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা একটু আগে গিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা দেখতে পান।
তিনি বলেন,‘বাজার করতে গেলেও পরিস্থিতি ভালো না দেখে মাদ্রাসার কিছুদুর আগে থেকে বাড়ির দিকে রওয়ান দেই আমরা। কয়েক পা এগুতেই পেছন থেকে হঠাত একটি গুলি এসে জসিমের ঘাড়ে লাগে।‘
কোন দিক থেকে গুলি আসলো তা বুঝে উঠতে পারিনি।
ইয়াছিন জানান, জসিম গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথমে তাকে হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি দেখে সেখান থেকে বেসরকারি হাসপাতাল তাহরিম ও আধুনিক হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানেও অবস্থার উন্নতি না দেখে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
চমেক হাসপাতালে পোস্টমর্টেম শেষে মঙ্গলবার বিকেলে বাড়ি আনা হয় জসিমকে। মাগরিবের নামাজের তার জানাজার নামাজ শেষে রাত সাড়ে ৮টায় বাড়ির মসজিদের পাশে পারিবারিক করস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
বাবা ডাক শুনলো না জসিম:
গত বছরের ১৩ এপ্রিল বিয়ে করে জসিম। এক সন্তানের জনক হয়েছেন তিনি। মো.মাহমুদুল হাসান নাম সন্তানের।
সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করার জন্য কিছুদিন সুযোগ পেলেও বাবা ডাক শুনতে পারলেন না জসিম উদ্দিন। আর মাত্র আড়াই মাস বয়সে বাবা হারালেন অবুছ ছোট্ট শিশুটি। পৃথিবীতে এসেই বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হলো মাহমুদুল হাসান।
তার এ কষ্টই যেন নির্বাক করে দিয়েছে জসিমের বাবাকে। নাতিকে কোলে নিয়ে বসলেও কোন কথাই যেন বের হচ্ছিল না তার মুখ দিয়ে।
কেবল অকারণে ঝড়ে যাওয়া সন্তান আর নাতির ভতিষ্যতের কথা ভেবেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। আর ছেলের নাম উচ্চারণ করে কাঁদছেন।    
আল্লাহ আমাকে নিয়ে যাও:
সকল মা-বাবাই চায় তার ছেলে দীর্ঘকাল। তাদের আগে সন্তানের মৃত্যু সহ্য করতে পারেন না কখনো। তার ব্যাত্যয় ঘটেনি জসিমের মা-বাবার ক্ষেত্রেও।
জসিমের মা বার বার বলে উঠিছিল,‘আল্লাহ আমি আমার ছেলেকে কোথায় পাব। আমার আগে আমার ছেলেকে কেন নিয়ে গেলা। আমার আর বেঁছে থেকে কি লাভ। আল্লাহ আমাকেও নিয়ে যাও।‘ 
‘আমার নাতি বাবা ডাকবে কাকে। সে কোথায় পাবে বাবা। তাকে কেন তুমি এতিম করলা।’

No comments:

Post a Comment